নৈঃশব্দ্যের কথাবার্তা

আলাপ সালাপ স্বগতঃ সংলাপ

Month: জুলাই, 2015

বিজ্ঞান ও ধর্মের সেতু-সম্পর্কিত চারটি সহজ টোটকা

এক.

এই পোস্টটি চর্বিত-চর্বন মনে হতে পারে। একটি অতি-পুরাতন বিতর্ককে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি। ইব্রাহিমীয় ধর্মের অনুসারীদের সাথে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রায়শই কিছু বিষয় ঘুরে-ফিরে আসতে থাকে। অনেকবার অনেকভাবেই বিবর্তন-অজ্ঞদের এসকল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, বিভ্রান্তি দূর করে সঠিক সত্যটি জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও তর্কগুলো শেষ হয় না। নতুন নতুন আঙ্গিকে পুরানো প্রশ্নই উত্থাপিত হতে থাকে। এজন্যই হয়তো কবীর সুমন গেয়েছেন, “প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা…

সেদিকে যাচ্ছি না। সম্প্রতি ফেসবুকে মাশরুফ হোসেন বিবর্তন, বিজ্ঞান এবং ধর্ম সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেখানে আলোচনা যখন সমাপ্ত হলো আর সবাই নিজ নিজ তালগাছ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন, তখন পুরো আলোচনাটি আবার পড়লাম। পড়ে ভাবলাম একটু অন্য আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা যায় কি না। প্রথমেই মূল লেখাটি পড়ে নেয়া যাক। স্ট্যাটাসদাতার অনুমতিসাপেক্ষে পাবলিক স্ট্যাটাসটি হুবহু নিচে তুলে দিচ্ছি।

দুহাজার পনের সালে এসে এই শিরোনামে একটি লেখা লিখবার মানে একটাই, এদেশের বিজ্ঞানমনস্কতার অবস্থা শোচনীয়। তাও লিখতে হচ্ছে, কারণ বিবর্তনবাদকে “শুধুমাত্র একটা থিওরি, এটা নিউটনের সূত্রের মত মেনে নেবার কোন কারণ নাই” বলার মত লোকের সংখ্যা অগণিত। প্রচন্ড লজ্জার বিষয়, এই কথাটা বলে মূলতঃ ছদ্মশিক্ষিতরা, সার্টিফিকেট থাকলেও জ্ঞান যাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। এদের মধ্যে মেডিকেল স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে কার্নেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র‍্যাজুয়েট করা সায়েন্স টিচারও আছে।
বাংলাদেশী আমেরিকান বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ঋতু সরকার আমার ক্ষুদ্র জীবনে দেখা সবচাইতে আলোকিত মানুষদের একজন। অসামান্য ধীশক্তির অধিকারী এই তরুনী সম্প্রতি আমার একটি পোস্টে এই “থিওরি বনাম ল” ডিবেট এর একেবারে পরিপূর্ণভাবে সমাপ্তি টেনেছে। Sauropod Fossil এর উপর ভিত্তি করে সর্বপ্রথম ত্রিমাত্রিক প্রিন্টেড রবোটিক ডায়নোসর প্রজেক্টে কাজ করে আসা ঋতু যে ওর বিষয়ে প্রচন্ড দখল রাখে, তা ওর কথাতেই বোঝা যায়। ওর সুদীর্ঘ কমেন্টের কিছু অংশ বাদে বাকি সারসংক্ষেপই হচ্ছে আজকের স্বচ্ছচিন্তা:
নিউটনের সূত্র কাজ করে সীমিত পদার্থ সংক্রান্ত পরিবেশে। পরিবেশ যখন অসীম এবং আমরা যখন আলোর গতি নিয়ে পরীক্ষা করছি, তখন নিউটনের সূত্র(Law) কাজ করেনা, আইন্সটাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) ব্যবহার করতে হয়। কাজেই , থিওরি আর সূত্র নিয়ে এত কচলাকচলির কিছু নেই। এই দ্বিধা ক্লাস সিক্সের বাচ্চার থাকতে পারে, ন্যূনতম বায়োলজি জানা কোন ধাড়ী খোকার নয়।
নিউটনের মত ডারউইনেরও সীমাবদ্ধতা আছে। ডারউইন তাঁর থিওরি দিয়েছিলেন গালাপাগোস দ্বীপের পর্যবেক্ষণ থেকে, সেখানের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি কিছু নতুন ধারণার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন তাঁর তত্ত্বের কিছু কিছু জিনিস মিলছেনা( যেটা নিয়ে ত্যানাবিদেরা ত্যানা প্যাঁচায়)। এর কারণ, ডারউইন Gene এবং Mutation সম্পর্কে জানতেন না। এ কারণে তিনি তাঁর তত্ত্ব পুরোপুরি প্রমাণ করে যেতে পারেননি, যেটা আমরা পারি। ডারউইনের সময় গুগল এবং ইমেইল থাকলে মেন্ডেল তাঁকে সহায়তা করতে পারতেন এবং দুজন মিলে ফাঁকগুলো ভরাট করতে পারতেন।
মেন্ডেলের জেনেটিক্স একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও স্টার্টিং পয়েন্ট হিসেবে দারুন। এ যুগে আমাদের হাতে অকাট্য সব প্রমাণ আছে, যা ক্ষুদ্র (জেনেটিক্স এবং বায়োকেমিকেল ডাটা) ও বৃহৎ (ফসিল এবং জীবন্ত প্রাণী) দুই ক্ষেত্রেই সন্দেহাতীতভাবে বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করে এবং ক্রিয়েশনিস্ট থিওরিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
কাজেই, ধর্মকে এর স্পিরিচুয়াল জায়গায় রাখুন, আত্মিক উন্নতিতে এর সহায়তা নিন। বিজ্ঞানের নিক্তি দিয়ে ধর্মকে জায়েজ করতে গেলে শুধু নিজেকেই নন, যে ধর্মকে আপনি জায়েজ করতে যাচ্ছেন সেটাকেও হাসির খোরাক বানাবেন।
ঋতুর বক্তব্য এখানেই শেষ, আমাদের চিন্তার শুরু।
অন্ধকার কেটে যাক জ্ঞানের আলোয়!

এবারে আসি মন্তব্যের ঘরে। স্বভাবতই বিতর্কিত বিষয় বলে এই পোস্টে প্রায় তিনশতাধিক মন্তব্য হয়েছে। বাকি সমস্ত মন্তব্য বাদ দিয়ে আমি যে তর্কে অংশ নিয়েছি সেটুকুতে ফোকাস করবো। মূল পোস্টের কিছু পরেই একজন প্রশ্ন তুললেন, ধরি তার নাম “বিবর্তন-সন্দিহান“।

বিবর্তন-সন্দিহানঃ

১. আপনার পোস্টে কীভাবে ক্রিয়েশনিস্ট থিওরি বানচাল হলো? বিবর্তন সত্যি হলেও প্রথম প্রজাতিটা তো কোন না কোনভাবে সৃষ্টি হয়েইছিল, নাকি? সবকিছু শূন্য থেকে এসে, তাহলে শূন্যটা কোথা থেকে এলো?
২. ফসিল থেকে বিবর্তন তত্ত্বকে প্রমাণ করার কাজটা বিজ্ঞানের কোন প্রজেক্টে হয়েছে?
৩. এই তত্ত্বকে নিউটন আর আইনস্টাইনের সাথে মেলাবেন না, কারণ নিউটনের তত্ত্বের প্রমাণ আমরা দৈনন্দিন জীবনেই দেখতে পাই। আর আইনস্টাইনের তত্ত্বকেও আণবিক শক্তি তৈরির সময় ব্যবহার করে প্রমাণ করা গেছে।
৪. আপনি যে বললেন, “এই কথাটা বলে মূলত: ছদ্মশিক্ষিতরা” এটা আসলে ঠিক না। কারণ এমন অনেক বিজ্ঞানীই আছে যারা এর ব্যাপারে সন্দিহান, আর তারা আপনার চেয়ে বেশিই জানেন। আপনি তাদেরকে ছদ্মশিক্ষিত বলতে পারেন না।
৫. জিন এর কোডিং আর ফসিল কীভাবে বিবর্তন তত্ত্ব প্রমাণ করে সেটার লিংক দিবেন আশা করি।

এই প্রশ্নগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। অত্যন্ত “যুক্তিযুক্ত” প্রশ্ন। বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের সাধারণ জ্ঞান অতি সীমিত, প্রায় নেই বললেই চলে, আর সাথে আছে প্রচলিত ভুল- ও মিথ্যা-বয়ান। একজন এগিয়ে আসলেন উত্তর দিতে-

উত্তরদাতা১- “বিবর্তন-সন্দিহান, আমরা তো অহরহই বিবর্তনের প্রমাণ দেখছি। অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া অথবা কীটনাশক-রেজিস্ট্যান্ট কীটপতঙ্গের কথা শুনে থাকবেন নিশ্চয়ই। এছাড়াও হালকা রঙের মথ পাওয়া যায়, যেগুলো শিল্পবিপ্লবের পরে ছাইরঙা হয়ে গেছে।”
বিবর্তন-সন্দিহানঃ “কিন্তু এই ঘটনাগুলো দিয়ে তো সৃষ্টির উৎপত্তিকে নাকচ করা যায় না। আর এগুলো প্রমাণ ঠিক শক্তপোক্ত নয়। কারণ নইলে এই “থিওরি” সবাই গ্রহণ করে নিতো। মথের রঙবদল শিল্পবিপ্লব থেকে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটতে পারে, যেমন তেজস্ক্রিয়তা থেকে অনেকের ক্যান্সার হয়।”
উত্তরদাতা১- “শক্তপোক্ত না কে বলেছে? বহু-প্রতিষেধক-রোধী যক্ষা একটা ভয়ানক রোগ, ভারতকে জিজ্ঞেস করে দেখেন। মথের রঙ তেজস্ক্রিয়তার কারণে বদলায় না। শিল্প-কারখানা থেকে আসা ছাইয়ের সাথে ক্যামোফ্ল্যাজ নিতে মথের জিন “নির্বাচন-চাপ” থেকে এই রঙ বেছে নেয়। মানুষ বিবর্তনকে মেনে নিতে পারে না কারণ ইব্রাহিমীয় ধর্মে আদম ও ইভকে প্রথম মানব-মানবী বলা হয়েছে। এরকম অনেক কিছুই যেমন সমকামীদের বিয়ের অধিকার মানুষ মেনে নিতে চায় না কারণ ধর্মে নিষেধ করেছে। কিন্তু তারপরও সমকামীরা ঠিকই বিয়ে করছে।”
বিবর্তন-সন্দিহানঃ “হাসালেন। আমি “মানুষ” নিয়ে কথা বলছি না, আমি বিজ্ঞানীদের কথা বলছি। গুগল করেই দেখেন কতজন বিজ্ঞানী এই “থিওরি”কে মেনে নিয়েছেন আর তাদের মধ্যে কতজন বিশ্বাসী। আর হ্যাঁ, এই পরিবর্তনগুলো ভৌগলিক কারণে হয়েছে নাকি বিবর্তনের কারণে, তা পরিষ্কার না। পরিবেশ বদল, তেজস্ক্রিয়তা এসব কারণেও এমন পরিবর্তন ঘটে। এটা বিবর্তন না। আর তারপরেও মোদ্দা কথা থেকেই যায় যে বিবর্তন সৃষ্টিতত্ত্বকে বাতিল করতে পারে না।”

এই পর্যায়ে আমি বিবর্তন-সন্দিহানের সাথে সরাসরি আলোচনায় যোগ দিলাম। খেয়াল করলাম, “থিওরি” বলতে তিনি বিজ্ঞানের ভাষাকে অনুসরণ করছেন না। বিজ্ঞানের ভাষায় থিওরি বা তত্ত্ব একটি পুনঃপুনঃপরীক্ষিত বিষয়, তিনি “থিওরি” বলতে “হাইপোথিসিস” বুঝাচ্ছেন, যা আদতে একটি প্রস্তাবনা যা এখনো সম্পূর্ণরূপে (তথ্য-উপাত্ত-পরীক্ষণ দ্বারা) প্রমাণিত হয় নি। এছাড়াও খেয়াল করলাম তিনি বিবর্তন বিষয়ে সন্দিহান, তাই প্রথমেই সেই সন্দেহের ভিত্তিটিকে বুঝে নিতে চাইলাম, “বিবর্তন-সন্দিহান, দয়া করে একজন বিজ্ঞানীর লিখিত পিয়ার-রিভিউড জার্নাল দেখাতে পারবেন যিনি বিবর্তনকে মিথ্যা/সঠিক না/ঘটে নি বলে দাবি করেছেন এবং প্রমাণ করে দেখিয়েছেন?”

উত্তরে বিবর্তন-সন্দিহান বললেন, “আপনি দয়া করে একজন বিজ্ঞানীর লিংক দেখান যিনি এটাকে সত্যি বলে প্রমাণ করেছেন”।

[স্বভাবতই, প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন আসলে কালক্ষেপণ ছাড়া কিছু না। তাই একটু বিরত হলাম।]

এরই ফাঁকে উত্তরদাতা১-এর সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে বিবর্তন-সন্দিহান এমন একটি কথা বললেন, যা থেকেই এই পোস্টের অবতারণা!

উত্তরদাতা১- “যিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনই বুঝেন না, তার সাথে বিবর্তনের সত্যমিথ্যা নিয়ে আলাপ করা আমার পক্ষে সম্ভব না! হাল ছাড়ছি।”

বিবর্তন-সন্দিহানঃ “প্রাকৃতিক নির্বাচন তো বিবর্তনেরই একটি প্রক্রিয়া, আর আমি বিবর্তন নিয়েই সন্দিহান। তাই আমি প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়েও সন্দিহান। যা বলছিলাম, ওসব পরিবর্তনের পেছনে তেজস্ক্রিয়তা বা অন্য কোন কারণ যে নেই তা কেউ প্রমাণ করে দেখাতে পারে নি। আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করি, বিবর্তন ইসলামের বিরুদ্ধে যায়, এজন্য কিন্তু আমি তর্ক করছি না। কারণ একটা সম্ভাবনা আছে যে ইসলাম বিবর্তনকে সমর্থন করে, এমনকি অনেক ইসলামী পণ্ডিতও এটা সমর্থন করেন। হতে পারে আদম ও হাওয়ার আগেও সৃষ্টি ছিল, হতে পারে আদম এবং হাওয়া পৃথিবীতে মিলিত হবার পর থেকেই বিবর্তন শুরু হয়েছে। আমি তর্ক করছি কারণ বিবর্তন তত্ত্বটি নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।”

বোল্ড করা লাইনগুলো আজকে আবার পড়তেই একটু থমকে গেলাম। একটু চিন্তা করা দরকার এখানে। চলুন, বিবর্তন-সন্দিহানের কথার পেছনে উদ্দেশ্যকে সৎ ধরে নিয়েই এই অবস্থানটিকে একটু বিশ্লেষণ করি। তিনি আস্তিক, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন, এবং ধার্মিক, অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থের নিয়ম-কানুন মেনে চলেন বা চলার চেষ্টা করেন। আর দশজনের মতোই ধর্মের সকল বিষয়কেই তিনি সত্য ভাবেন, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। এ নিয়ে আমার আসলেই কোন বিরোধিতা নেই। আমার মতে প্রত্যেক মানুষেরই অন্যের কোনরূপ ক্ষতি না করে নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস ও বিশ্বাস পালনের অধিকার আছে। এটাও পরিষ্কার যে বিবর্তন-সন্দিহান বিজ্ঞানের প্রতি অনুকূল ভাবনা পোষণ করেন। তিনি তাদের দলেও পড়েন না, যারা ধর্মের আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে বিজ্ঞানকে প্রতিপক্ষ ও ক্ষতিকর বিদ্যা হিসেবে গণ্য করে। বৈজ্ঞানিক সত্য যখন ধর্মীয় লিখিত রূপের সাথে অমিল বা বিরোধ সৃষ্টি করছে, তখন স্বভাবতই তিনি ধর্মের অনুকূলে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন, আবার একটি সেতু নির্মাণের চেষ্টা করছেন ধর্মীয় টেক্সট থেকে বিজ্ঞানের টেক্সট অবধি। যে সেতুটির মাধ্যমে তিনি সহজে ধর্মবিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক সত্যের মাঝে সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। “বিজ্ঞানময় কিতাব” ধরনের গ্রন্থ এবং অজস্য ওয়েবসাইটগুলো এই সেতুর প্রকৌশলী, রাজমিস্ত্রি, ও শ্রমিক। এগুলোরই উদয়াস্ত শ্রমে গড়ে ওঠে “নির্ভেজাল” ও “টেকসই” সেতুটি।

যারা এই সেতু নির্মাণ করেন, তারা দুটো বিষয় সবসময় খেয়াল রাখেন। এক. ধর্মগ্রন্থের বাণীর কাব্যময় ভাষা থেকে উৎপন্ন দ্ব্যর্থবোধকতা (ambiguity) এবং অনিশ্চিত অর্থ, এবং দুই. বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট ধারণার ব্যাপারে ভাসাভাসা জ্ঞান (popular knowledge)। এ যেন সেতুর সুদৃঢ় দুই থাম, দুই তীরের আছড়ে পড়া স্রোতকে বেঁধে রেখেছে। বিবর্তন তত্ত্বের ব্যাপারে এই বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সৃষ্টিবাদীরা (creationists) প্রধানত ইব্রাহিমীয় ধর্মগ্রন্থগুলোর কাব্যিক ও প্রাগৈতিহাসিক ভাষাকে আশ্রয় করে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন টুকরো বাক্য ও অনুচ্ছেদ তুলে আনে। কিন্তু অপ্রামাণ্য এসব বাক্য জীববিজ্ঞান কিংবা জিনবিজ্ঞানে মূল্যহীন। প্রাণিজগতের বিভিন্ন খুঁত ও গরমিল দেখিয়ে আমরা “নিখুঁত” বলে দাবি করা এই সৃষ্টিবাদকে ভুল প্রমাণ করতে পারি। তাই পরবর্তী ধাপে অচিরেই এর পাল্টা-জবাব হিসেবে সৃষ্টিবাদ ও বিবর্তন মিলিয়ে একটি জগাখিচুড়ি বানানোর প্রক্রিয়া চলে। সৃষ্টির পর স্রষ্টার আদেশে/নির্দেশেই বিবর্তন নাকি চালু হয়েছে। একটি ঘরানা দাবি করছে প্রাণিকূলে একমাত্র মানুষ ব্যতিরেকে বাকি সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ বিবর্তন মেনে চলছে। মানুষকে স্রষ্টার আদলে গড়া হয়েছে বিধায় তা বিবর্তনের উর্ধ্বে। আদিমানুষ প্রজাতিগুলোর ফসিল সেই দাবিকে বাতিল করে দেয়। সেক্ষেত্রে আবার বলা হচ্ছে, মানুষেরও ক্রমবিবর্তন ঘটেছে, তবে তা কেবলই উন্নতির দিকে। এই দাবিকেও বানচাল করে দেয়া যায়। কিন্তু দেখা যায় এই দাবি উত্থাপনকারীদের বিবর্তনের ব্যাপারে উচ্চতর জ্ঞান নেই। তারা শুধুই ধর্মগ্রন্থ পড়েছেন, বিবর্তনের খুঁটিনাটি বিষয়-আশয় তারা তেমন বোঝেন না। ফলিত জিনবিদ্যার বিভিন্ন গবেষণাপত্র তাদের মাথার দুই মাইল উপরে উড়তে থাকে। অনেকে বিবর্তন বলতে বোঝেন “বানর থেকে মানুষ এসেছে এই থিওরি”, অনেকে এটা দাবি না করলেও মানুষের বিবর্তনের আধুনিক আবিষ্কারগুলোর ব্যাপারে কিছুই জানেন না। সুতরাং ধর্মগ্রন্থের দ্ব্যর্থবোধক বাক্য এবং বিজ্ঞানে দুর্বল ভিত্তি – এই দুইয়ে মিলে গড়ে তোলে গ্রন্থময়-বিজ্ঞান কিংবা বিজ্ঞানময়-গ্রন্থের ধ্যানধারণা।

দুই.

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই একগুঁয়ে সেতুটিকে ভাঙার উপায় কী? সেই উত্তর-সন্ধানের আগেও প্রশ্ন হলো, আদৌ কি ধর্ম ও বিজ্ঞানের এই সেতুবন্ধন ভাঙার দরকার আছে? বিজ্ঞানের শনৈ শনৈ উন্নতির কালের বয়স খুব বেশি নয়, মোটের ওপর পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ বছর। এই অল্প সময়েই ধর্মের মত প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের অচলায়তন ভেঙে পড়েছে। মানুষের সম্মিলিত জ্ঞানের সমষ্টিকে মানুষই সংরক্ষণ করছে, এবং সেই জ্ঞান সহসা বিলুপ্ত হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। বরং মননশীলতার সুযোগ ও স্বাধীনতা পেয়ে মানুষ ক্রমেই নিজের জ্ঞান বাড়িয়ে চলেছে। এই তো, গতকালই মানুষের বানানো নভোযান প্লুটোবাবুর উঠোন দিয়ে “হাই! হ্যালো!” বলতে বলতে উড়ে গেল। আধুনিকতম যুগের মানুষ ধর্মের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা কমিয়ে দিয়েছে অনেকাংশেই। রোগবালাই হলে আধুনিক মানুষ দোয়া পড়ার আগে ডাক্তারের কাছে যায়, রাস্তাঘাটে বেরুনোর আগে গন্তব্য দেখে নেয় গুগল ম্যাপে। আবার এটাও ঠিক যে পৃথিবীর অনেক অংশেই এই জ্ঞানের আলো পৌঁছায় নি। এখনো সেখানে অন্ধত্ব ও অন্ধকার বাস করে। এই বৈপরীত্যের দূরত্বও যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি যে অমন অন্ধকারেই ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামি ঘাঁটি গেড়ে বসে। পাঁচশ’ বা এক হাজার বছর আগে যে অন্ধত্ব দূর করতে শিক্ষাদীক্ষার আলোই যথেষ্ট হতো, এখন সেখানে ভিন্ন উপায় প্রয়োজন হয়। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের জগদ্দল পাথরের প্রতিরোধক্ষমতা বেড়েছে। এই প্রতিষ্ঠানও আধুনিক হয়ে উঠেছে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর বিজ্ঞান-মূর্খতার কারণে ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মিশিয়ে উপরে বর্ণিত একত্রীকরণ (amalgamation) ঘটেছে, সেতুতে সেতুতে ভরে উঠেছে মগজ। তাই আমার মতে, এই সেতুটিকে যুক্তির পথে ভেঙে দেয়াই যুক্তিযুক্ত। সেতুটি ভেঙে পড়লে উপকার ব্যক্তিমানুষেরই। আমরা যদি তা বুঝতে ও বোঝাতে সক্ষম হই, তাহলে হয়তো “ডেমোলিশন” দ্রুত ও সহজ হবে।

এবারে আসি সেই প্রশ্নে, এই সেতু ভাঙার উপায় কী? বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি আর বৈচিত্র্যময় মানুষের মতনই বহুবিধ উপায় থাকতে পারে। আর সত্যি বলতে কী, আমার নিজের মাথাও চাচা চৌধরির মতো প্রখর নয়, যে মুস্কিল আসান এক তুড়িতেই বাতলাতে পারবো। তবুও কিছু কিছু ভাবনা মাথায় এসেছে, যেগুলো গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে। ধাপে ধাপে বলি।

প্রথমত, আমার মনে হয় ধৈর্য আর সময়ের পরীক্ষা এটি। ধৈর্যের সাথে কাউকে এই সেতুবন্ধনের খারাপ দিকটি বুঝাতে পারলে বাকি পথটুকু তিনি নিজেই খুঁজে বের করে নিতে পারবেন। দ্বিতীয়ত এটা খুবই পরিষ্কারভাবে বলতে হবে যে কারো ব্যক্তিগত অধিকারকে খর্ব করার কোন প্রচেষ্টাই এখানে হচ্ছে না। স্রষ্টা মানা ও ধর্ম পালনের অধিকার ব্যক্তির প্রাপ্য, এবং সেখানে অন্যের নাক বা হাত বা অন্য কোন অঙ্গ গলানোর এখতিয়ার নেই। তৃতীয়ত, কাউকে ধর্ম ত্যাগ করতেও বলা হচ্ছে না, বরং ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মাঝে গোঁজামিলের সেতুটি ভাঙতে বলা হচ্ছে। ধর্মপালনের সকল অধিকার যেমন তার আছে, তেমনি তার অধিকার আছে আধুনিক বিজ্ঞানে শিক্ষিত হওয়ার। চতুর্থত (এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপ), বিজ্ঞানের বক্তব্য যেখানে ধর্মগ্রন্থের সাথে সাংঘর্ষিক, সেখানে তাকে বোঝাতে হবে যে অনেক ধর্মের অনেক পুরানো নিয়মই বাতিল হয়ে গেছে। তার কারণ উন্নত সমাজব্যবস্থায় নতুন নিয়মের দরকার হয়েছে। এখন এই ২০১৫ সালে তিনি যে নিয়মকানুন মেনে চলেন, সেগুলো মূলত এখনো সমাজের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক না বলেই তিনি মানছেন। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে ক্রমশ এসকল নিয়মও অচল হয়ে পড়বে এবং মানুষ উন্নততর সমাজ গড়ার নিমিত্তে নতুন নিয়ম বানিয়ে নিবে। কাকতালীয়ভাবে এটাও বিবর্তনের মতোই ধীর ও জটিল প্রক্রিয়া। তাই হাতে-নাতে প্রমাণ দেয়ার কিছু নেই। এখন তার কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি পুরাতন আংশিক-অচল নিয়মকে আঁকড়ে ধরে থাকবেন, এবং ক্রমেই ধর্মগ্রন্থের দ্ব্যর্থবোধক বাক্যের সাথে বিজ্ঞানের সূত্রের ভাষা মেলাবেন? নাকি তিনি ধীরে ধীরে গ্রহণ করে নিবেন বৈজ্ঞানিক পন্থা আর যুক্তির শানিত অস্ত্র?

একজন রাজনঃ আই ওয়াজ কিয়োর্ড, অল রাইট!

গত বুধবার (জুলাই ৮, ২০১৫) সিলেট শহরতলীর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শেখ সামিউল আলম রাজনকে খুঁটির সাথে বেঁধে ক্রমাগত পিটিয়ে হত্যা করে তিন যুবক। আর এই দৃশ্য মুঠোফোনে ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড করে তাদেরই একজন। রাজনের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে। রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান পেশায় মাইক্রোবাসচালক। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে রাজন বড়। অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা রাজন সবজি বিক্রি করত। সবজি বিক্রির টাকা দিয়েই চলতো রাজনের পরিবারের খরচ।

রাজনের লাশ গুমের সময় হাতেনাতে মুহিত আলম (২২) নামের একজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় লোকজন। মুহিতসহ চারজনকে আসামি করে জালালাবাদ থানায় হত্যা মামলা করেছেন রাজনের বাবা। মামলার অন্য আসামিরা হলেন মুহিতের বড় ভাই সৌদি আরব প্রবাসী কামরুল ইসলাম (২৪), তাঁদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী (৩৪) ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না (৪৫)।  চুরির অভিযোগ এনে গত বুধবার সিলেট শহরতলীর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শিশু রাজনের ওপর নির্যাতন চালান কামরুল ইসলাম, আলী হায়দার ও ময়না। তাঁদের নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করেন মুহিত। তিনিই প্রথম ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন।

[খবরের সূত্রঃ এখানে, সতর্কীকরণঃ খবরের ছবি ও ভিডিও মনের ওপর চাপ ফেলতে পারে। স্ক্রিনশটঃ এখানে, ছবি ও ভিডিও সরিয়ে রাখা হয়েছে।]

গতকাল থেকে শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টা মাথা থেকে বের করতে পারছি না। সেদিন সকালে বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার খেলা ছিল। ভোরবেলা উঠে দেখি বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে চেপে ধরেছে, প্রথম ইনিংসে আফ্রিকা ৯৫/৫। হাত মুখ ধুয়ে আসতে আসতেই ১০০/৬। বেশ ভাল লাগছিল, স্ট্রিমিং দেখা শুরু করলাম। একটু পরেই ফেসবুকে দেখি এই ভয়ানক খবর। তারপর খেলায় জেতার পরেও গলায় কাঁটা আটকে থাকার অনুভূতি হচ্ছে। এক পর্যায়ে ফেসবুকই বন্ধ করে দিলাম। চারপাশের নানা মুনির মতামত আর ভাল লাগছিল না।

শিশুটিকে চোর অপবাদে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এরকম মারামারি আমাদের দেশে অহরহই ঘটে। প্রতিদিনই এরকম চোর বা পকেটমার ধরা পড়লে পাবলিক একত্র  হয়ে তাকে মার দেয়। কখনো কখনো পুলিশ এসে তাদের নিরস্ত করে, কখনো করেই না। শক্তপোক্ত  পোড় খাওয়া কেউ হলে মার খেয়ে টিকে যায়, কমবয়েসিরা মরে যায়। মারতে মারতে মেরে ফেলার পেছনে উন্মত্ত মবের মানসিকতাকে চিহ্নিত করেন কেউ কেউ। একজনকে ঘিরে যখন অনেকে মারতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্থিরভাবে চিন্তা করার অবস্থা লোপ পায়। সাধারণত এরকম পরিস্থিতিতে চোরকে যারা হাতে-নাতে ধরেছে, তেমন তিন থেকে পাঁচজন বেশি সক্রিয় থাকে। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে আশেপাশের পাবলিক সক্রিয় হয়ে ওঠে। সহিংসতা ক্রমশ সংক্রামিত হয়। এই মবের ভেতর হয়তো দুয়েকজন সহিংসতায় আক্রান্ত হয় না, কিন্তু তারাও নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়েই থাকেন। খুব কম পরিস্থিতিতেই সহিংসদের নিরস্ত করা যায়।

ফেসবুকে এই ভিডিও ছড়িয়ে যাওয়ার পরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা আমাকে বিস্মিত করে। এরকম ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহই ঘটে, আমরা অনেকেই এইসব ঘটনা বাস্তবে এড়িয়ে যাই। কোনখানে মানুষ একত্র হয়ে কাউকে মারছে দেখলে খুব কম মানুষই এগিয়ে গিয়ে সেটা থামাতে যায়। বেশিরভাগ দাঁড়িয়ে “মজা দেখে”, অনেকে নিজ নিজ কাজে চলে যায়। এই ঘটনা ইদানিং বেশি ঘটছে এমনও না, আগেও ছিল, এখনও আছে। ঘটনাগুলো এতোটাই “স্বাভাবিক” যে সবগুলো খবরের কাগজেও আসে না। যেসব ক্ষেত্রে ভিক্টিমকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, সেগুলোই সাধারণত খবর হয়ে ওঠে। গুগলে “চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা” লিখে সার্চ করলে প্রায় ৭৯,৮০০ ফলাফল পাওয়া যায়। এই সংখ্যাটি ভীতিকর। এই সংখ্যাটি প্রমাণ করে যে আমরা সমষ্টিগতভাবে ব্যাপারটিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে থাকি।

তাহলে রাজনের হত্যার ঘটনায় এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া কেন হচ্ছে? সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আমি অজ্ঞ। কেবল নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ উত্তরটিই চিন্তা করে দাঁড় করাতে পারি, তবে তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত উত্তর।

আমার মতে, রাজনের ঘটনায় এমন প্রতিক্রিয়ার পেছনে কতগুলো বিশেষ কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই ঘটনাটি first person point of view থেকে ভিডিও করা হয়েছে। রাজনকে ধরে একটা থামের সাথে বেঁধে রাখা থেকে ভিডিওটি শুরু হয়। আমি ১১-১২ মিনিটের ভিডিওটি দেখেছি, যেখানে ধীরে ধীরে মার খেতে খেতে রাজনের মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে যেতে থাকে। শুরুতে সে যেভাবে ক্ষমা চাচ্ছিল আর মার দেয়ার সাথে সাথে ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠছিল, সেটা ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। রাজন ক্লান্ত হয়ে পড়তে থাকে। ধারণা করি, তার ব্যথাবোধের অনুভূতিও ভোঁতা হতে শুরু করেছিল। ভিডিও ধারণ করেছিল হত্যাকারীদেরই একজন, এবং আমরা ক্যামেরার পেছনে তার কথা ও হাসিও শুনতে পাই। এর চেয়ে সরাসরি চোখের সামনে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মরে যেতে দেখা সম্ভব না। বেশ কিছুদিন ধরে মধ্য প্রাচ্যের আইসিস “ইনফিডেল”দের হত্যা করার সরাসরি ভিডিও প্রকাশ করছে। সেগুলো দেখলে প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ের বিবমিষা হতে বাধ্য। দর্শক সেখানে আইসিসের হত্যাকাণ্ডের স্থানে সরাসরি প্রবেশ করে, এবং হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে। ভিডিও বন্ধ করে না দেয়া পর্যন্ত নিজের অনিচ্ছাতেই দর্শককে এই নারকীয় ঘটনাগুলোর অংশ হতে হয়। রাজনের হত্যার ভিডিও দেখে দর্শকের মনে তাই তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত, আমার মনে হয় ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে যাওয়ায় এই প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি ভিন্ন মাত্রা, ভিন্ন তীব্রতা যোগ হয়েছে। ফেসবুকে বাংলাদেশি ইউজারের সংখ্যা কত জানার চেষ্টা করছিলাম। ফেসবুক জানাচ্ছে এই মুহূর্তে ১৩ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি ৩০ লক্ষ বাংলাদেশি ফেসবুক ব্যবহার করেন। অডিয়েন্স হিসেবে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিডিওটি যে কোন সময়েই এক ক্লিকে দেখতে পারবেন। এছাড়াও ভিডিওটি ইউটিউবে আছে, গুগল করলে শ’খানেক নিউজ-পোর্টালে আছে, এবং এটা বিভিন্ন ইমেইল সার্ভার দিয়েও ছড়িয়েছে। মোবাইল ফোন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে আক্ষরিক অর্থেই ইন্টারনেট এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। এমন অবাধ তথ্যের স্বাধীনতা যেমন উপকারী, তেমনি দানবীয় শক্তিও বটে। রাজনের মৃত্যুর ভিডিও তাই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্টারনেটকে অনেকেই স্রেফ বিনোদনের জন্য ব্যবহার করেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে ফেসবুক দেশের সাথে সরাসরি যোগসূত্রের মাধ্যম। এরকম মাধ্যমে যখন রাজনের মৃত্যুর ভিডিও এসে পড়ে, তখন আমরা সরাসরি বাস্তবের এক ভয়াবহ ধাক্কা খাই। এটা তখন আর স্রেফ বিনোদন আর চটুল রসিকতার জায়গা থাকে না। চ্যানেল পাল্টে দিলেই যে খবরকে এড়িয়ে যাওয়া যেতো, কিংবা পত্রিকার পাতা উল্টে যে খবরকে না পড়েও দিন শুরু করা যেতো, সে খবর এখন এড়ানোর আর উপায় নেই।

“এ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ” মুভির অ্যালেক্সকে চোখের পাতা জোরপূর্বক খুলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাতজি জার্মানির ধ্বংসযজ্ঞ দেখানো হয় (দৃশ্যটি এখানে)। অ্যালেক্সের অপরাধের শাস্তি বা সংশোধনের ধাপ হিসেবে তাকে এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। রাজনের হত্যার ভিডিও দেখে ফেসবুকে তীব্র চিৎকার করে ওঠা আপামর বাংলাদেশিদের দেখে কেন জানি এই দৃশ্যের কথাই বারবার মনে পড়ছিল। এমন তো নয় যে আমরা এমন অপরাধ স্বচক্ষে এই প্রথম দেখছি, কিংবা এর চেয়ে ভয়ানক অপরাধ আর আগে ঘটে নি। বরং এই হত্যাকাণ্ড আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির অংশই বটে। আমরা এর চাইতেও ভয়ানক অপরাধের সাক্ষী। কিন্তু এবারের ঘটনার বিশেষত্ব হলো, এটি ঘটছে আমাদের বিনোদন ও স্বস্তির এলাকায়, আমাদের ফেসবুকিং ও meme-জীবনে, আমাদের কমেডি ও স্যাটায়ারের বর্ণিল বাবল্‌-এ রাজনের আর্তচিৎকার ঢুকে পড়েছে। ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জের অ্যালেক্স নিজে পিটিয়ে খুন করেছে, তার কাছে তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসের ফিল্ম বেশি কিছু লাগার কথা না। কিন্তু সে চিৎকার করে ওঠে কারণ যুদ্ধের ফিল্মের পটভূমিতে বিইটোভেনের নবম সিম্ফোনির সুর আবহ সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটা শুনে সঙ্গীতপিপাসু অ্যালেক্সের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বিইটোভেন তার কাছে স্বর্গীর সুরস্রষ্টা, আনন্দ ও স্বস্তির জায়গা। তাই তাকে যখন সহিংসতার পটভূমিতে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটা অ্যালেক্সের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। আমাদের জন্যেও ফেসবুকের বিনোদনের সাথে রাজনের ভিডিওর উপস্থিতি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলেই এতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখছি।

রাজনের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিক্রিয়ার তৃতীয় ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক কারণটি হলো, আমাদের সম্মিলিত মননে ও চিন্তায় আমরা নিশ্চিত না যে এই অপরাধের বিচার হবে এবং এই নারকীয় মারধরের সংস্কৃতি নির্মূল হবে। আমরা জানি যে রাজনের হত্যাকাণ্ডের মূল অপরাধীদের একজন কামরুল ইসলাম শুক্রবারেই (১০ জুলাই) দ্রুত সৌদি আরব পালিয়ে গিয়েছিল। ছয় লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সিলেটের পুলিশই তাকে সাহায্য করেছে পালিয়ে যেতে। সামাজিক মাধ্যম থেকে খবর মাধ্যমে এই হত্যার প্রতিবাদ তীব্র হলে সৌদি পুলিশের সাহায্য নিয়ে সোমবারে কামরুলকে আটক করা হয়েছে। আদালতের দীর্ঘসূত্রিতায় এই অপরাধের শাস্তি হতে কতদিন লাগবে তা আমরা জানি না। আমরা এটাও জানি না যে আদৌ তাদের অপরাধ প্রমাণিত হবে এবং যথাযথ শাস্তি হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অপরাধী ক্ষমতাবান ও অর্থশালী হলে প্রায় কখনই তার শাস্তি হয় না। যে সকল ঘটনায় আমরা শাস্তি হতে দেখছি, সেখানে জনগণ ও মিডিয়ার সক্রিয়তা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। আমাদের সম্মিলিত আগ্রহ কমে এলে বিচারপ্রক্রিয়াও একপ্রকার থেমে যায়। তারপরও আশাবাদী হয়ে ধরে নিচ্ছি যে ফেসবুকের তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে আমরা এই অপরাধের বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে দেখবো। রাজনের বাবা-মা ন্যায়বিচার পাবেন। অপরাধীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু তারপরেও কি আমরা নিশ্চিত যে রাজনের মতো আর কেউ গণপিটুনিতে মারা যাবে না? এই নিত্যনৈমিত্তিক মারপিটের ঘটনা ঘটতেই থাকবে, পাশবিক মব যা আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষিত বাংলাদেশিদের দিয়ে গড়া, তারা তীব্র রোষে অন্য কোন চোর বা পকেটমারকে মেরে খুন করে ফেলবে। এই নৃশংস সংস্কৃতি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই অভাবিত ও নিষ্ঠুর সত্যের সামনে রাজনের নিষ্প্রাণ মুখ আমাদের আজ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে আমরা আর আয়নার সামনে চোখ তুলে তাকাতে পারছি না।

বন্যা আপা

ফেসবুকের একটা সাম্প্রতিক ফিচার হলো ‘save this link/video’ সুবিধা দেয়া। কেউ কোন কিছু শেয়ার করলে সেটাকে পরে পড়া বা দেখার জন্য রেখে দেয়া যায়। গত সপ্তাহখানেক ধরে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। শান্তি মতো কোন কিছু পড়ার মন ছিল না। তাই আজকে ছুটির দিনে সেসব লিংক পড়তে বসলাম। রায়হান অনেকগুলো পোস্ট দিয়েছে, বন্যা আপার ভলতেয়ার বক্তৃতা নিয়ে। সেগুলো দেখলাম। বিবিসি বন্যা আপার একটা ইন্টারভিউ প্রকাশ করেছে আজকেই। ইন্টারভিউটা দেখে কেন যেন মনে হচ্ছিল ইন্টারভিউ গ্রহণকারী খুবই বেসিক প্রশ্ন করছিলেন। সম্ভবত তাদের চ্যানেলের দর্শকরা এই পর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তি ধারণ করেন। তারা বেশিরভাগই ধার্মিক এবং ধর্মভীরু। তারা অনেকেই হয়তো ভাবতেই পারেন না একজন নাস্তিক কেমন হয়। নাস্তিকরা আসলে কেন নাস্তিক, কিংবা তারাও আসলে কোন ভুলভাল করছেন কি না, সেটা তাদের কাছে একটা প্রশ্ন। বন্যা আপা যখন বললেন যে তিনি ১৩ বছর বয়স থেকেই অবিশ্বাসী, সেটা শুনে ইন্টারভিউ গ্রহণকারীকে বিস্মিতই মনে হলো। ইন্টারভিউয়ের পরে স্টুডিওতে কয়েকজন মিলে আলোচনাও করলো। এসবক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, দুই মতধারার কয়েকজনকে এনে একটা তর্কের পরিস্থিতি গড়ে তোলা হয়। একদিকে দুয়েকজন ফ্রিডম অফ স্পিচ নিয়ে কথা বললো, আরেকদিকে দুইজন বিশ্বাসী অভিযোগ করলো যে তারা নাস্তিকের কথায় অফেন্ডেড হয়, তাই নাস্তিকদের বুঝেশুনে কথা বলা উচিত। অতঃপর এসব আলোচনার শেষে মিলেমিশে গেল তারা দুই দলই। দেখে একটা পাদ ছাড়লাম।

নিক কোহেন বন্যা আপার ভলতেয়ারের বক্তৃতা নিয়ে একটা ব্লগ লিখেছেন। সে বক্তৃতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশে ইসলামিস্ট রাজনীতি এবং তুলনায় এসেছে ইংল্যান্ডের ইসলামিস্ট রাজনীতির পরিস্থিতি। রায়হানকে ধন্যবাদ লেখাটাকে বাংলায় অনুবাদ করার জন্য। পুরো বিষয়টা এর চেয়ে ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যেতো না। আগ্রহীরা লিংকগুলোতে ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি সম্পূর্ণভাবেই আশাহত হয়ে পড়েছি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের নিয়ে। যেদিকে তাকাই অস্ফূট দুয়েকটি ঝিলিক দেয়া আলো ছাড়া বাকিটা মিশমিশে অন্ধকার দেখি। একটি পশ্চাদপসর জাতিতে আমার জন্ম। এই জাতি পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতায় শিক্ষায় কোন অবদানই রাখে নি। আজও সামাজিক কুসংস্কারের আখড়া বানিয়ে মানুষের জীবনকে পিষে মারা হয় বাংলাদেশে। এখানে খুব কম মানুষই স্বপ্ন দেখে, তাদেরও অনেকেই ঝরে যায় স্বপ্নকে সফল করার আগে। এই জাতির খুব কম মানুষই সাহসী। সাহসকে এখানে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কেউ ভুল করেও কোন সাহসী কাজ করে ফেললে আমরা সাধারণত তাকে দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমরা ভয় পাই কারণ এই সাহস এক অচেনা চরিত্র আমাদের কাছে, আর অচেনাকে ভয় পাওয়াই মানুষের ধর্ম। সাহসের কারণে সেই মানুষটি অতি দ্রুত টার্গেটে পরিণত হন। অনেকেই নিন্দা ও সমালোচনা করে তার থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করে নেন। এতে তাদের একটা লাভ হয়। কিছুদিন পরে যখন ঘাতকরা সাহসী মানুষটিকে খুন করতে আসে, তখন নিন্দা ও সমালোচনাকারীরা নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারেন। তেলাপোকার জীবনও এত অর্থহীন না!

সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো এই জাতির অজ্ঞানতার তালগাছ আঁকড়ে ধরার চরিত্রটি। কালেভদ্রে কোন কালজয়ী মানুষ যখন এই জাতিকে পথ দেখায়, তখন গোঁয়ার-গোবিন্দের মতো নিজেদের গোঁড়ামি আর অন্ধত্বকেই প্রাণপনে চেপে ধরে এরা। এই ঘটনাটি বারবার ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে সামাজিক নেতা পর্যন্ত, লেখক থেকে শিক্ষক পর্যন্ত অনেকেই সুউচ্চ আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। এবং ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগও এই জাতিকে তালগাছের মায়া ছাড়াতে পারে নি।

গতকাল সুপারম্যান ভার্সাস ব্যাটম্যান মুভির ট্রেলার রিলিজ পেয়েছে। সেখানে ব্রুস ওয়েইনের একটা সংলাপ এরকম, “বিশ বছর পরে আর গথামে কয়জন ভালো মানুষ বেঁচে আছে? যারা আছে তারা কয়জনই বা আর ভাল আছে?”

বাংলাদেশকে বরাবরই আমার গথামের মত নষ্টভ্রষ্টপতিত শহরের মতো মনে হয়। ব্রুস ওয়েইনের এই কথাটা হয়তো তাই আমাদের জন্যই বেশি খাটে। আমাদের ভালো মানুষদের মেরে ফেলা হয়। আর যারা ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকেন, তারাও টিকে থাকার প্রয়োজনে নিজেদেরকে বদলে ফেলেন!